টিকটকের আড়ালেই অপরাধী চক্র

সাখাওয়াত কাওসার, (বিএনএস)ঃ

গত বৃহস্পতিবার (১৮ নভেম্বর) সকাল থেকে হঠাৎ করেই নিখোঁজ তিন সহোদর বোন। একজন ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী, বাকি দুজন এসএসসি পরীক্ষার্থী। তাদের গ্রামের বাড়ি যশোরে হলেও রাজধানীর মোহাম্মদপুর হাউজিংয়ের খালার বাসায় থেকে পড়াশোনা করছেন। এ-সংক্রান্ত খালা রাজধানীর আদাবর থানায় সাধারণ ডায়েরিও (নম্বর-৮৭৫) করেছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্টদেরই তিনি বলেছেন, তিন বোনই টিকটকে আসক্ত দীর্ঘদিন ধরে। তবে গতকাল বিকালে তিন বোনের অবস্থান শনাক্তের কথা জানিয়েছে র‌্যাব-পুলিশ। যদিও খালা এ প্রতিবেদককে বলেছেন, আমরা শুনেছি তিন বোন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে আছে। তবে এখনো তাদের সঙ্গে আমার কথা কিংবা দেখা হয়নি। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার নেপথ্য নিয়ে এখনই অফিসিয়াল মন্তব্য না করলেও তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে এ বিষয়টিতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

‘টিকটক সেলিব্রেটি’ বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে এক কিশোরীকে অপহরণ ও ধর্ষণ করছিল মাহি ও দিনার নামের দুই তরুণ। গত ১১ নভেম্বর খিলগাঁও ও বনানী থেকে দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে কিশোরীকে তালতলা মার্কেট এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়।

এ-তো গেলো মাত্র দুটি ঘটনা। তবে গত তিন বছরে ‘টিকটক’ কেন্দ্রিক একের পর এক অপরাধের ঘটনায় উদ্বিগ্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। রীতিমতো সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘টিকটক’। উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীরা টিকটক ব্যবহার করে জড়িয়ে যাচ্ছে ভয়ঙ্কর সব অপরাধে। সেলিব্রেটি হওয়ার ঘোরে তাদের অনেকেই বুঁদ হয়ে পড়ছে মাদকের নেশায়। নারী পাচারের ক্ষেত্রেও ‘টিকটক’কে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে সংঘবদ্ধ চক্র। সারা দেশ থেকে টিকটকের আড়ালে এসব চক্রের মাধ্যমে ২ হাজারের অধিক মেয়ে পাচার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কেবলমাত্র আশরাফুল মন্ডল ওরফে বস রাফি সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই পাঁচ শতাধিক নারী এরই মধ্যে পাচারের শিকার হয়েছে বলে এলিট ফোর্স র‌্যাবকে জানিয়েছেন বিভিন্ন সময় গ্রেফতারকৃতরা। গোয়েন্দারা বলছেন, দেশের উঠতি তরুণ-তরুণীদের একটি অংশ এখন টিকটকসহ বিভিন্ন মিউজিক অ্যাপসমুখী। আর এই অ্যাপসকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে বিভিন্ন গ্রুপ।

এসব গ্রুপের নারী সদস্যদের ভারত এবং দুবাইয়ের বিভিন্ন মার্কেট, সুপার শপ, বিউটি পার্লারে ভালো বেতনে চাকরির অফার দিয়ে প্রলোভনে ফেলছে বহুল পরিচিত টিকটকাররা। বস রাফির অন্যতম সহযোগী ম্যাডাম সাহিদার দুই মেয়ে সোনিয়া ও তানিয়া পাচার চক্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও সক্রিয়ভাবে জড়িত। সাহিদা দেশে একটি সেফ হাউস পরিচালনা করতেন, আর তার দুই মেয়ের ভারতে রয়েছে সেফ হাউস। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ‘জনপ্রিয়’ টিকটকারদের বেশির ভাগই অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত। কেউ সেলুনে কাজ করে, কেউ দিনমজুরের কাজ করে। কেউবা কোনো দোকানের বিক্রয়কর্মী। এর বাইরে স্কুল, কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও কেউ কেউ টিকটকে নিজেদের বিলিয়ে দিচ্ছে। কম গতির ইন্টারনেটেও টিকটক-লাইকি অ্যাপ চালানো ও ভিডিও আপলোড করার সুযোগ থাকায় ঢাকার বাইরে এমনকি গ্রাম পর্র্যন্ত এদের ব্যবহারকারী বেড়ে চলেছে। গোয়েন্দারা বলছেন, অশ্লীল ভিডিও তৈরিতে জড়িত লাইকি ও টিকটকারদের তালিকা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এরই মধ্যে কমপক্ষে ৫০টি গ্রুপের সন্ধান মিলেছে, যারা অশ্লীল ভিডিও  তৈরি করে। এসব ভিডিও দেখে তরুণ-তরুণীসহ শিশুরাও বিপথে যাচ্ছে। এ অবস্থায় ওই সব টিকটক ও লাইকি নির্মাণকারী এবং এসব প্ল্যাটফরমে অভিনয়কারীদের শনাক্ত করতে মাঠে নেমেছে পুলিশ ও র‌্যাব। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, লাইকি, টিকটক, ইমো, মাইস্পেস, ফেসবুক, ইউটিউব, স্ট্রিমমেকার, হাইফাইভ, বাদু ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কী ধরনের অপরাধ হচ্ছে, তা নজরদারি করা হচ্ছে। পৃথিবীর কোন কোন দেশে টিকটক-লাইকির মতো অ্যাপ বন্ধ করেছে এবং করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য, গত ১১ মাসে দেড় শ জনের বেশি কথিত টিকটক অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যারা বিতর্কিত এই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে অল্পবয়সী কিশোরী থেকে তরুণী ও মধ্যবয়সী নারীদের ফাঁদে ফেলে অনৈতিক সম্পর্ক করে আসছিল। এসব নারীর অনেককে পাচারও করা হয়েছে উন্নত জীবনযাপনের প্রলোভন দেখিয়ে।

দেশে টিকটকের আড়ালে মানবপাচার ও অনৈতিক বিভিন্ন কর্মকান্ডের মূলহোতা টিকটক হৃদয়, নদী আক্তার, বস রাফি, ম্যাডাম সাহিদা। এদের মধ্যে ২৮ মে ভারতে হৃদয় গ্রেফতার এবং ২২ জুন নদী আক্তার ও ৩১ মে রাফি ও ম্যাডাম সাহিদা গ্রেফতার হয় র‌্যাবের হাতে। র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল মশিউর রহমান জুয়েল বলেন, আমরা এরই মধ্যে অনেক টিকটকারদের গ্রেফতার করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া দরকার। আমাদের সাইবার পেট্রলিং, ডিজিটাল মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে। চিহ্নিত টিকটকারদের নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি বেশ কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে র‌্যাবের তদন্তে উঠে এসেছে, নিজের টুকিটাকি ভিডিও দিতে দিতে পরিচয় হয় টিকটকের কথিত জনপ্রিয় কয়েকজন সেলিব্রেটির সঙ্গে। এদেরই একজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভুয়া পরিচয়ধারী ‘রাজ’। র‌্যাবের পরিচয় দেওয়া রাজের বেশভুষা আর ফলোয়ারের সংখ্যা দেখে মজে যান ২৫ বছরের তরুণী রুবি (ছদ্মনাম)। এক পর্যায়ে তা শারীরিক সম্পর্কে গিয়ে ঠেকে। তবে কিছু দিনের মধ্যেই রুবি বুঝতে পারেন রাজের প্রতারণা। সর্বস্ব হারিয়ে অভিযোগ দেন র‌্যাবের কাছে। রুবিসহ আরও তিন নারীর অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার হন টিকটক রাজ। তদন্তে উঠে আসে, রুবির মতো শতাধিক নারীকে সর্বস্বান্ত করেছেন বগুড়ার ২৪ বছর বয়সী রাজ। তাকে গ্রেফতারের পর র‌্যাবের কাছে একের পর এক আসতে থাকে ভুক্তভোগী নারীদের অভিযোগ। তারা সবাই টিকটক করতে গিয়ে রাজের ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হন। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সিটি সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের সিনিয়র এসি ধ্রুব জ্যোতির্ময় গোপ  বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে সাইবার অপরাধ।

কিশোর-কিশোরীদের এর থেকে দূরে রাখতে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া জরুরি। তবে সাইবার জগতে আমাদের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ করে পালানোর সুযোগ কোনোভাবে পাচ্ছে না অপরাধীরা। গত মে মাসে ভারতের বেঙ্গালুরুতে বাংলাদেশি ২২ বছরের এক তরুণীকে বিবস্ত্র করে যৌন নির্যাতনের ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হয়। এ ঘটনায় দুজন নারীসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করে ভারতের পুলিশ। তাদের সবাই ছিল বাংলাদেশি। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, এই চক্রের মূলহোতা রিফাতুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় বাবু। ওই তরুণীকে এরাই ভারতে নিয়ে যায়। এরপরই টিকটকের মাধ্যমে অনৈতিক কর্মকান্ড ও মানব পাচারের মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। টিকটক হৃদয় মূলত নির্যাতনের শিকার তরুণীকে টিকটকের ফাঁদে ফেলে ভারতে নিয়ে যায়। এরপর সেখানে উচ্চ বেতনে চাকরি দেওয়ার কথা বলে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ওই তরুণী তাতে রাজি না হওয়ায় তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে সেই ভিডিও ভাইরাল করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এসব ঘটনায় রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় পৃথক দুটি মামলা হয়। এই মামলায় প্রায় ডজনখানেক টিকটকারকে গ্রেফতার করে পুলিশ। যাদের সবাই টিকটকের আড়ালে পাশের দেশে নারী পাচার ও অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল। তাদেরই একজন নদী আক্তার ইতি। যদি এ রকম অন্তত ১০টি নাম রয়েছে তার। টিকটকের আড়ালেই তিনি নারী পাচারকারী দলের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করতেন। ভারত, মালয়েশিয়া ও দুবাইয়ে তিনি নারী পাচার করেছেন। ২১ জুন নদীসহ তার চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেফতার করে রাজধানীর হাতিরঝিল থানা পুলিশ। এই নদীর ভারতীয় আধার কার্ডও ছিল। নদীর স্বামী ছিলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী রাজীব হোসেন।

দুই বোনকে ৩ লাখে ভারতে বিক্রি : বছর দুই আগে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার দরিদ্র পরিবারের দুই তরুণী চাকরি নেয় শ্রীপুর উপজেলার জৈনাবাজার এলাকার একটি বিস্কুট ফ্যাক্টরিতে। পাশেই বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করত তারা। সেখানেই টিকটক চক্রের নারী পাচারকারীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে তাদের। চক্রের সদস্য সুজন নেত্রকোনার ও অপরজন ইউসুফ ময়মনসিংহের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দিয়ে সম্পর্ক উন্নয়ন ও বিশ্বাস অর্জনের জন্য পাশাপাশি বসবাস, দেখা-সাক্ষাৎ শুরু করে। একপর্যায়ে বড় বোনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে ইউসুফ। মাসে ৫০ হাজার টাকা আয়ের লোভ দেখিয়ে তারা দুই তরুণীকে নিয়ে টিকটক ভিডিও বানায়। এরপর জীবননগর সীমান্ত দিয়ে ভারতের রানাঘাট এলাকায় নিয়ে দুই বোনকে ৩ লাখ টাকায় নারী কারবারিদের কাছে বিক্রি করে দেয়। পশ্চিমবঙ্গের দিঘা এলাকার বিভিন্ন বাসায় ও হোটেলে রেখে তাদের দিয়ে দেহ ব্যবসা চালানো হচ্ছিল। পরে পাচারকারীদের নজরদারি এড়িয়ে দুই বোন পালিয়ে অন্য প্রদেশে যায়। পরে তাদের দেশে ফেরত নিয়ে আসা হয় একটি এনজিওর সহায়তায় ।