আজ নূরুল মোমেনের ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকী

নিউজ ডেস্কঃ

নুরুল মোমেন ছিলেন একাধারে অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ, নাট্যকার ও নির্দেশক, রম্য সাহিত্যিক, কলামিস্ট, পথিকৃৎ মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, অনুবাদক, কবি, প্রসিদ্ধ বাগ্মী, শিশুসাহিত্যিক এবং প্রাবন্ধিক। আধুনিক বাংলা নাটকে অগ্রণী ভূমিকার জন্য তাকে ‘নাট্যগুরু’ সম্বোধন করা হয়। তিনি ১৯০৬ সালের ২৫ নভেম্বর ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএল ডিগ্রি নিয়ে ১৯৩৬ সালে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করেন। ১৯৪১ রেডিওর জন্য রচনা ও নির্দেশনা দেন কমেডি নাটক ‘রূপান্তর’। নাটকটি পরে আনন্দবাজার পত্রিকা তাদের পূজা সংখ্যায় প্রকাশ করে। তার রচিত অন্য রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে- নেমেসিস, যদি এমন হতো, নয়া খান্দান, আলোছায়া, শতকরা আশি, আইনের অন্তরালে, রূপলেখা, হোসেন সফদরের উইল, ভাই ভাই সবাই, এইটুকু এই জীবনটাতে, যেমন ইচ্ছা তেমন, আদিখ্যাতা, লন্ডন প্রবাসে, হ-য-ব-র-ল, অন্ধকারটাই আলো, ঠিক চলার পথ প্রভৃতি। ১৯৯০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

নাট্যকার ও নির্দেশক এবং প্রাবন্ধিক অধ্যাপক নূরুল মোমেনে। যিনি নাট্যগুরু (A Pioneer of Modern Drama) হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। নূরুল মোমেন ছিলেন একাধারে শিক্ষাবিদ, নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক, রম্যরচয়িতা, আইনবিদ, বেতার ও টিভি ব্যক্তিত্ব এবং প্রাবন্ধিক। একজন লেখক হিসেবে তার মৌলিক পরিচয় নাট্যকার হিসেবে। সামাজিক পটভূমিকায় দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় তার নাট্যচরিত্রগুলো সুন্দরভাবে রূপলাভ করে। জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও নূরুল মোমেন বিলাসী জীবনযাপন করেননি। বরং জীবনের পরিধি মাপার জন্য, নিজেকে ভাসিয়ে দেন সাংস্কৃতিক জীবনে। ১৯১৯ সালে স্কুল জীবনে রবীন্দ্রনাথের সোনার তরীর ছন্দে রচিত তার কাব্য-নাট্য 'সন্ধ্যা' বিখ্যাত সাময়িকী 'ধ্রুবতারায়' প্রকাশিত হয়। ওমর খৈয়মের রুবাইয়াতের প্রখ্যাত অনুবাদক কান্তিচন্দ্র ঘোষ কাব্যটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। নাট্যগুরু নুরুল মোমেন আমাদের রম্য রচনারও পথিকৃৎ। সমকালীন সমাজের অসঙ্গতি ও দ্বন্দ্বসমূহ তিনি ব্যঙ্গরসের মাধ্যমে নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরেন। সাহিত্যের দু’টি ধারায় এমন পথিকৃতের ভূমিকা খুবই বিরল উদাহরণ। নাট্যশিল্পী হিসেবে এটা তাঁর বড় কৃতিত্ব। শুধু নাটকেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না নূরুল মোমেন, সমাজের যে কোনো ভালো কাজে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল সর্বাগ্রে। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র'-এর ২য় খ- এবং ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬১ এর পাকিস্তান অবজারভার, ইত্তেফাক, সংবাদ এবং আজাদ অনুযায়ী ১৯৬১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কার্জন হলের সিম্পোজিয়ামে প্রধান বক্তাদের মধ্যে একজন ছিলেন নাট্যগুরু নূরুল মোমেন। দীর্ঘ ৮২ বছরের জীবনে ক্রমান্বয়ে সৃষ্টি করেন গুরুত্বপূর্ণ সমস্ত সৃষ্টিকর্ম। যারই ধারাবাহিকতায় তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে "নাট্যগুরু" হিসেবে সম্বোধন করা হয়। অনবদ্য নাট্যকার নূরুল মোমেনের আজ ১১০তম জন্মবার্ষিকী। ১৯০৮ সালের আজকের দিনেতিনি ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাবিদ, নাট্যকার ও নির্দেশক নূরুল মোমেনের জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।

নুরুল মোমেন ১৯০৮ সালের তৎকালীন যশোর জেলা বর্তমান ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার বুরাইচের খান বাহাদুর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা নুরুল আরেফিন ছিলেন জমিদার ও পেশায় একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। নূরুল মোমেন প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন কলকাতায়। এরপর ১৯১৬ সালে তিনি খুলনা জেলা স্কুলে ভর্তি হন। পরবর্তীতে ১৯২০ সালে ঢাকা মুসলিম হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯২৪ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সারাদেশে ৩২তম স্থান অর্জন করেন এবং সে বছরই ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে ভর্তি হন। ১৯২৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়ে মাত্র পাঁচ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএ-তে ভর্তি হন নূরুল মোমেন। এক বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি হল মিলে প্রথম নাট্যানুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের 'মুক্তধারার' বটু চরিত্রে অভিনয় করেন। এখানে অভিনয়ে তিনি প্রথম স্থান দখল করেন। তবে এর আগে কোনো মুসলমান ছাত্র নাটক বা অভিনয়ে অংশগ্রহণ করেননি। ১৯২৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র দুজন ছাত্র প্রথম বিলেট ইন্টিলিজেন্সি টেস্টে পুরস্কৃত হয়। একজন নূরুল মোমেন এবং অপরজন বুদ্ধদেব বসু। এর পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএল ডিগ্রি লাভ করে ১৯৩৬ সালে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করেন নূরুল মোমেন। ১৯৩৯ সালে ঢাকায় "অল ইন্ডিয়া রেডিও" প্রতিষ্ঠা হলে, মোমেন নতুন এই মাধ্যমের সুযোগ গ্রহণ করেন এবং তার প্রথম মুসলিম লেখক হয়ে ওঠেন। নুরুল মোমেনের প্রথম নাটক রূপান্তর ১৯৪২ সালে ঢাকা বেতার-এ প্রচারিত হয়। তিনি নিজে নাটকটি পরিচালনা করেন। এই নাটকের প্রগতিশীল প্লট এবং প্রধান চরিত্র নারী হওয়ার কারণে প্রথাগত মুসলিম বাংলা নাটকের মধ্যে নতুন ধারার উন্মেষ ঘটে যার ফলশ্রুতিতে কবি ও সাহিত্য সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার তার প্রশংসা করেন। ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা তাদের পূজা সংখ্যায় নাটকটি প্রকাশ করে। ১৯৪৭ সালে নাটকটি গ্রন্থরূপে প্রকাশিত হয়।

১৯৪৫ সালে নুরুল মোমেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে যোগ দেন। আইন বিভাগে নাট্যগুরুর প্রিয় ছাত্র ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নুরুল মোমেন শেখ মুজিবকে জর্জ বার্নার্ড শ এবং বাট্রার্ন্ড রাসেল পড়তে অনুপ্রেরণা দেন। ফলে ওই দু’জন এবং রবীন্দ্রনাথ তার প্রিয় লেখক হয়ে ওঠেন তার শিক্ষকের মতোই। এমনকি নুরুল মোমেনের পরামর্শ অনুযায়ী শেখ মুজিব রাসেলকে এতই ভালোবেসে ফেলেন যে, পরে তার ছেলের নাম রাখেন শেখ রাসেল। সম্প্রতি ভয়েস অব আমেরিকাকে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক সাক্ষাত্কারে এই তথ্য প্রকাশ পায়। ১৯৪৮ সালে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য তিনি ইংল্যান্ড গমন করেন এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে ডিগ্রি (১৯৫১) লাভ করেন। তিনি বিবিসি, ঢাকা বেতার ও টেলিভিশনেরও কিংবদন্তি সৃষ্টিকারী ব্রডকাস্টার ছিলেন। লন্ডন অবস্থানকালে তিনি বিবিসি-র বাংলা অনুষ্ঠানে ‘কাকলী’ নামে শিশুদের আসর পরিচালনা করেন। এ সময় লন্ডনে পাকিস্তান দূতাবাসে তিনি এক বছর শিক্ষা অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের দ্বিতীয় আধুনিক নাটক 'নেমেসিস' রচনা করেন নাট্যগুরু নূরুল মোমেন। এটি বাংলাদেশের প্রথম নিরীক্ষামূলক নাটক। ১৯৪৫ সালে নাটকটি শনিবারের চিঠি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আর গ্রন্থরূপে প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে। নেমেসিস নাটকটি পঞ্চাশ-দশকের মন্বন্তরের পটভূমিতে রচিত। এর রচনাশৈলী ও পরিকল্পনা অভিনব। একটি মাত্র চরিত্রের মাধ্যমে দীর্ঘ সংলাপের ভিতর দিয়ে পুরো নাট্যকাহিনী বিবৃত হয়েছে যার মধ্যে একটি পরিপূর্ণ ছবি পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। ফলে নাটকটি নাট্যামোদীদের কাছে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয় এবং এ নাটকের মাধ্যমে তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যে অধিষ্ঠিত হন। আড়াই ঘণ্টাব্যাপ্তি একটি এক চরিত্রের ঘটনা। বিশ্বনাটকের তিন হাজার বছরের ইতিহাসে নূরুল মোমেনের আগে এক চরিত্রের নাটক লেখা হয়েছে মাত্র দুটি। তবে কোনোটিই ত্রিশ মিনিটের বেশি নয়। নেমেসিস নাটকটিকে বিশ্বমানের নাটক বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন বিদগ্ধ সমালোচক ম্যালকম মাগারিজ, পিটার আর্চার, মার্জুরি জোনস, সজনীকান্ত দাস, আশুতোষ ভট্টাচার্য প্রমুখ। ১৯৫৫ সালে নুরুল মোমেনের ইংরেজি নাটক ‘আনডারনীথ দি ল’ দেখে বিশ্ববিখ্যাত সমালোচক ম্যালকম মাগারিজ ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তাকে বাংলাদেশের নাটকে আধুনিকতার পথিকৃত্ বলে আখ্যায়িত করেন। বিশ্ববিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব পিটার আর্চার নুরুল মোমনকে বাংলাদেশের আধুনিক নাটকের জনক বলে আখ্যায়িত করেন। বিশ্বের ক্ষুদ্রতম নাটকটি রচনা ও পরিচালনা করেন নূরুল মোমেন। এটির ব্যাপ্তি ১৩ সেকেন্ড। নাটকটিতে চরিত্র তিনটি চেকের পাতা, অটোগ্রাফের পাতা এবং সই। নাট্যগুরু নুরুল মোমেনের সৃষ্ট পথ ধরেই পঞ্চাশের দশকে তার শিষ্য সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, মুনীর চৌধুরী, আশকার ইবনে শাইখ, সাঈদ আহমেদ, আবদুল্লাহ আল মামুন, মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, সেলিম আল দীন প্রমুখের মতো নাট্যকার আত্মপ্রকাশ করেন।

নাট্যগুরু নূরুল মোমেনের অন্যান্য বিখ্যাত নাটকঃ যদি এমন হতো (১৯৬০), নয়া খান্দান (১৯৬২), আলোছায়া (১৯৬২), আইনের অন্তরালে (১৯৬৬), শতকরা আশি (১৯৬৭), রূপলেখা (১৯৬৯) ও যেমন ইচ্ছা তেমন (১৯৭০) ইত্যাদি। তিনি বেতার, টেলিভিশন ও মঞ্চের (বিশেষত কার্জন হলের) জন্য শতাধিক নাটক রচনা ও পরিচালনা করেন। ১৯৬২ সালে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম আইনবিষয়ক গ্রন্থ মুসলিম আইন রচনা করেন তিনি। তার বিখ্যাত প্রবন্ধ গ্রন্থের মধ্যে 'দৃষ্টি অন্যতরো, আলোকের ঝর্নাধারা, ২১শে ফেব্রুয়ারি, লেটস উই ফরগেট' ইত্যাদি। ১৯৬৭ সালে বেতার ও টিভিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিকর্ম প্রচার বন্ধের প্রতিবাদ করেন তিনি। তিনি বাংলা বর্ণ পরিবর্তনের সাহসী প্রতিবাদও জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাকালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট (১৯৫৭) ছাড়াও তিনি আইন বিভাগের ডিন (১৯৬৩), প্রক্টর ও ট্রেজারার ছিলেন। ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন। সাহিত্যকর্মে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৫৪ সালে কলকাতায় সংবর্ধনা, ১৯৬১ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার, ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়-এর ইন্টারন্যাশনাল প্লেয়ার্স সংগঠনের সংবর্ধনা,১৯৬৬ সালে ব্রিটেনের থিয়েটার ব্যক্তিত্বগণ কর্তৃক সংবর্ধনা, ১৯৭৭ বাংলাদেশের থিয়েটার নাট্যদল কর্তৃক সংবর্ধনা এবং ১৯৭৮ সালে একুশে পদক লাভ করেন।

১৯৯০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার গুলশানে তার নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন শিক্ষাবিদ, নাট্যকার নূরুল মোমেন। যিনি আজও বেঁচে আছেন তাঁর কর্মের মাঝে। ইতিহাসের কাছে যাওয়া মানে অতীতে ফিরে যাওয়া নয়। ইতিহাস চেতনা মানুষকে করে মহিমান্বিত, গৌরবদীপ্ত। সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়। নাট্যগুরু নূরুল মোমেন ঐতিহ্যকে সম্প্রসারিত করেছেন আমাদের আধুনিক মন ও মননে। বাংলাদেশের নাট্যরীতিতে আধুনিকতার পথিকৃত্ নূরুল মোমেনের আজ ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকী। শিক্ষাবিদ নূরুল মোমেনের মৃত্যুবার্ষিকীতে আন্তরিক শ্রদ্ধা।